এবার জন্মের আগেই পঞ্চম শ্রেণি পাস, ভুয়া সনদে চাকরি

প্রবীর এক সময় বিদ্যুৎ অফিসের বিভিন্ন মিটার রাইডারদের একান্ত সহযোগী হিসেবে দৈনিক মজুরিতে কাজ করত। সরকারি চাকরি ছাড়া এভাবে প্রায় ৮/১০ বছর চলে। এই সুবাদে জড়িয়ে পড়ে নানা অনিয়মে। সন্ধান পায় আলাদীনের চেরাগের। মিটার জালিয়াতি ও অবৈধ লাইন সংযোগ দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে ভারি করে পকেট। কিছু দিনের ব্যবধানে একসময়কার রাইডারদের একান্ত সহযোগী প্রবীর আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়। তার এ অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যায়।

সাথে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির হোতা মৌলভীবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লাইন সাহায্যকারী প্রবীর দাসের অনিয়মের চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে কর্তৃপক্ষ তাকে লাইন সাহায্যকারী থেকে অভিযোগ কেন্দ্রে স্থানান্তর করেছে।

একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, তার অনিয়মে অফিসের স্টাফরাও বিব্রত। অনেকেই লজ্জায় জনসম্মুখে চলাফেরা করতে পারছেন না। আবার প্রবীর বীরদর্পে বিভিন্ন জনের কাছে বলে বেড়াচ্ছে ‘পত্রিকায় লিখে আমার কিছুই করা যাবে না, আমি অনেক টাকা খরচ করে চাকরি পেয়েছি’।

বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়স সীমা ৩০ বছর। কিন্তু প্রবীর বিগত ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি ৪৪ বছর বয়সে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভোটার কার্ডে বয়স সংশোধন করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লাইন সাহায্যকারী’র চাকরি পায়। ওই চাকুরীতে শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি ছিল। কিন্তু প্রবীরের এ যোগ্যতা না থাকায় সে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আশেরা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় নাম দিয়ে জাল সার্টিফিকেট চাকরির জন্য জমা দেয়। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, নিজে ওই বিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ বানিয়ে সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত প্রবীর দাস রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পরেশ দাসের পুত্র। সে ১৯৭০ সালের ১০ অক্টোবর জন্ম গ্রহণ করে। নির্ধারিত বয়সে বাড়ির পার্শ্ববর্তী পাঁচগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৭৯ সালে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে। বিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার খাতা ঘাটিয়ে দেখা যায় পঞ্চম শ্রেণিতে তার রোল নং ৩ ছিল। পরে আর লেখাপড়ায় আগাতে পারেনি প্রবীর দাস।

জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর সিলেট অফিসে চাকরিতে যোগদান করলে পরবর্তীতে ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে প্রবীরকে স্থানান্তর করা হয়। তবে জাল জালিয়াতির বিষয়ে তারা কিছু বলতে পারেননি।

জেলা নির্বাচন অফিস ও একটি সূত্র জানা যায়, প্রবীর ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা নির্বাচন অফিস থেকে বাম হাতের লেনদেনে ১০/১০/১৯৭০ এর জন্ম তারিখ সংশোধন করে ১৫/০১/১৯৮২ করেন। যার ব্যবধান ১২ বছর। বর্তমান জন্ম তারিখ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রবীর জন্মের আগেই পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। এ নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা, সচেতন নাগরিক ও অভিজ্ঞ মহলের মধ্যে নানা প্রশ্ন বিরাজ করছে। বিদ্যুৎ এর মিটার এনালগ থাকা অবস্থায় মৌলভীবাজার শহরের অনেক লোক তার দ্বারা হয়রানির স্বীকার হয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজার পৌর এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর বাসায় ও দোকানে ত্রিফেজ লাইন সংযোগ দেবার প্রলোভন দেখিয়ে প্রবীর বিপুল অংকের টাকা আত্মসাৎ করে। পরে লাইন সংযোগও দেয়নি এমনকি টাকাও ফেরত দেয়নি। পূর্ব গির্জাপাড়ার একটি দু’তলা ও একটি টিনসেটের বাসায় পানির মটর, ফ্রিজ ও টিভিসহ নূন্যতম বিলে চালিয়ে নিত প্রবীর। জানা গেছে, তখন সে ওই বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকত। অবৈধ লাইন সংযোগ দেয়ার সুবাদে কোনো বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে হতো না।

এছাড়াও পৌর শহরের গির্জাপাড়া, কাজিরগাঁও, শাহ মোস্তফা সড়ক, সৈয়ারপুর ও শমসেরনগর সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় তার কুকর্মের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। এনালগ মিটার থাকা অবস্থায় অবৈধ লাইন সংযোগ দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা। সরকার বঞ্চিত হয়েছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে।

অনুসন্ধানে আরোও জানা যায়, ২০১৪ সালে চাকরিতে যোগদানের পর সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী পুলিশ ভেরিফিকেশন করার কথা থাকলেও প্রবীরের সনদপত্রে জালিয়াতি ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে অদ্যাবধি তার পুলিশ ভেরিফিকেশন আটকে আছে। বর্তমানে সে ৮ হাজার ৫’শ টাকা বেতন পাচ্ছে।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরাফাত জানান-‘আমি সদ্য যোগদান করেছি। এব্যাপারে আমি অবগত নয়। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। প্রবীরের চাকরি লাইন সাহায্যকারী হলেও পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর তাকে সিএ (অভিযোগ গ্রহণকারী) হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, জনবল কম থাকায় তাকে আপাতত এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে লাইন সাহায্যকারী প্রবীর দাসের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “আমি আপনার সাথে কথা বলতে পারব না। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আপনি কথা না বললে কে বলবে। এমন প্রশ্নর জবাবে প্রবীর কিছু বলতে রাজি হননি”।

আপনার মন্তব্য করুন...